জীবন কথা
লিখেছেন আলোকিত প্রদীপ, মে ২২, ২০১৫ ৪:২৪ পূর্বাহ্ণ


(এক)
আয়ান নামটা সুন্দর না? আমার ছেলের নাম। পাশেই ঘুমাচ্ছে ও। আমার টুকটুকে জানপাখিটা। কাঁদতে কাঁদতে গালগুলো লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে। ওর কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আমি তো ওকে সব কথা বুঝিয়ে বলেছি। ও কারো কথায় এভাবে মন খারাপ করে না। কিন্তু আজ হঠাৎ কি হল!
আমি কত দিন ধৈর্য ধরে ওর প্রতিটা খারাপ মুহূর্তে ওকে ভরসা দিতে পারবো জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় আয়ানকে সব সময় বুকে আগলে রাখি। কারো সাথে মিশতে দিব না। কিন্তু ওকে তো এই সমাজের মুখোমুখি হতেই হবে। সমাজের মানুষের সাথে মেশার শিক্ষা দেয়াটাতো আমারই দায়িত্ব। তাই, যতটা পারি ওকে একটা সুন্দর পরিবেশ দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

তবে, আজকে আমার কিবা করার ছিল। আয়ানকে যখন স্কুল থেকে নিয়ে আসছিলাম তখন কলোনিতে নতুন আসা শিহাবকে আয়ান একটু আদর করতেই শিহাব ফিসফিসিয়ে  বলল, আয়ান ভাইয়া! তোমার সাথে দেখলে আম্মু বকা দিবে। আম্মু তোমার সাথে মিশতে মানা করছে। আম্মু বলছে তোমার গায়ে পচা রক্ত।
প্রথম প্রথম আয়ানকে কেউ এ ধরণের কথা বললে আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকতাম। মুখে কথা আটকে যেত। একটা ঢোঁক গিলতেও খুব কষ্ট হতো। চোখ থেকে বের হতে চাওয়া পানি আবার চোখে ঢুকিয়ে ফেলতাম।
কিন্তু এখন আমার মুখের ভঙ্গীর এক বিন্দুও পরিবর্তন হয় না। আমি জানি, আমরা যত বড় বিপদেই পড়ি না কেন সেই বিপদকে দূর করার ক্ষমতা কিংবা বাঁধা থাকলেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আমাদের ভিতরেই থাকে। আসলে শিহাবের উপর রাগ করার কিছু নেই। বাচ্চারা সমাজ ও পরিবার থেকে যা শিখে তাই বলে। শিহাবের মত ফুটফুটে মুখ গুলোর উপর আমার কখনোই রাগ হয় না।
 আমি হেসে শিহাবের হাত ধরে বললাম, না বাবা! ওর গায়ে কোন পচা রক্ত নাই। আল্লাহ্‌ মানুষদের অনেক ভালোবাসেন, তাই সবাইকে একই রকম ভালো রক্ত দিয়েই বানান। তখনই দরজার সামনে শিহাবের আম্মু আসলো।

ভদ্র মহিলা দেখতে খুব হাসি-খুশি। আমি সালাম দিয়ে বললাম, খুব ভালো হলো দেখা হয়ে। শিহাবকে কয়েকবার দেখলেও আপনার সাথে পরিচিত হই নি। আজকে পরিচিত হওয়া যাবে। জানেন বোধহয়, আমি ৫ নাম্বার বিল্ডিঙয়ের ৩ তলায় থাকি।
তারপর, আমার মনে হলো শিহাবের আম্মু বাধ্য হয়েই আমাকে ভিতরে যেয়ে বসতে বললেন। আমি আসলেই শিহাবের আম্মুর সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। তাই সাথে সাথেই খুশি হয়ে আয়ানকে বললাম, আয়ান বাবা তুমি শিহাবের সাথে খেল আমি আন্টির সাথে একটু কথা বলি। শিহাবের আম্মুর মুখ একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেলেও তিনি দেখলাম নিজেকে সামলে নিলেন। বয়স হবার সাথে সাথে সবারই মনে হয় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নেয়া শিখে নিতে হয়।
 কথায় কথায় জানতে পারলাম তার নাম শায়লা। আয়ানের বিশ্রামের সময় হওয়ায় খুব বেশিক্ষণ ছিলাম না শিহাবদের বাসায়। এরই মাঝে শায়লা নিজেই আগ্রহ নিয়ে আমার অতীত সম্পর্কে জানতে চাইলো।

আমি বললাম, আপা, অতীতে কি দুর্ঘটনা হয়েছে এটা জেনে কি হবে। আমি বলতে চাই না, তা না। সেই কবেকার ঘটনা। এটা বেশীর ভাগ মানুষই এর-তার থেকে শুনে এমনিতেই জানে। আমার যেহেতু এ ঘটনায় বিন্দু মাত্র অপরাধ ছিল না। তাই, আমি এ ঘটনা নিয়ে কখনোই লজ্জা পাই না। জানেন, আয়ানকে পৃথিবীতে আনার ব্যাপারে, মামলা করবার ব্যাপারে আমি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখন আমার বাবা- মা বা অন্য কেউ রাজি ছিল না। কিন্তু আমি সবার সাথে লড়াই করে, বুঝিয়ে আদালতে গিয়েছিলাম।
বিদেশে পালিয়ে না গেলে আমি ঐ তিন পিশাচের শাস্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম। আমার সাথে যা হয়েছে এই জন্য না। বরং এই জন্যে যে, এরকম অপরাধীর সংখ্যা যেন আর না বাড়ে। আমার সাথে যা হয়েছে তা যেন আমার-আপনার মেয়ের সাথে না হয়।

শায়লাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। অথচ, প্রথমে মনে হয়েছিল, একটা বাচ্চাকে যে এ ধরণের কথা শেখায় সে অবশ্যই খুব নিচু মনের। আবারো আমি প্রমাণ পেলাম কেউ আমার কথা বুঝবে না ভেবে চুপ করে না থেকে আমাদের নিজেদের কিছু বলার থাকলে তা বলা উচিত। অনেকেই আছেন যারা বুঝিয়ে বললে বুঝে।
মানুষের সাথে থাকতে থাকতে অনেক সময়ই অন্যের মতামত শুনে আমরা গভীর ভাবে চিন্তা করি না। সেই মতামতকে সঠিক ভেবে নিজের মতামতে পরিণত করি। শায়লাও হয়তো এভাবে ভাবে নি আগে।
এ কথাও সত্য যে, অনেকেই আছে সব সময় আমাকে খারাপ ভাবে। প্রতি মুহূর্তে তারা আমাকে-আমার পরিবারকে সেই কত বছর আগের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। থাক! বাদ দেই। এ ধরণের মানুষের পাশাপাশি সামির মত মানুষও তো আছে। সব কিছু জানিয়ে তারপরই তো আমার সামির সাথে বিয়ে হয়েছে। সামিকে দেখে কখনোই বুঝা যায় না আয়ান ওর নিজের ছেলে না। অথচ, আমার এ ঘটনার জন্য আমার বোনদেরই বিয়ের ব্যাপারে ঝামেলা হয়েছিল।

(দুই)
আয়ান ঘুম থেকে উঠেই আযরার দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে বললো- আম্মু, একটু আমার পাশে আসবা?
আযরা আয়ানের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল- আব্বুজান! তুই আজকে শায়লা আন্টির কথায় এত মন খারাপ করেছিস কেন? আন্টি আসার সময় তোকে চকলেট দিল, কত্ত আদর করল!
আয়ান কিছুক্ষন চুপ থেকে হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে জিজ্ঞাসা করলো, আম্মু! আমার জন্য তোমাকে সবাই অনেক পচা কথা বলে। আমার জন্য তোমার অনেক কষ্ট হয়। না?  আমি কি অনেক পচা?
আযরা আয়ানকে কাছে টেনে নিতে নিতে বললো, ওরে আমার বুদ্ধু ছেলেটা! তুই কেন পচা হবি!  তোর জন্য পচা কথা বলবে কেন? আমি ছোট থাকতে তিনটা দুষ্ট মানুষ আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল। আমার যে খুব কষ্ট হয়েছিল, এই জন্য আল্লাহ্‌ আমাকে তোর মত ফুটফুটে একটা বাবু উপহার দিয়েছে। তুই যদি না থাকতি তাহলে আমাকে এভাবে আর কে ভালোবাসতো?                                                                                                                   (সমাপ্ত)

পোস্টটি ৭২৯ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য

Leave a Reply

4 Comments on "জীবন কথা"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
অর্ফিয়ুস
Member

খুব নাড়া খেলাম, খুব!
আয়ানের আম্মুরা সাহসী হয়ে উঠুক, পৃথিবীটা আয়ানদের জন্যও।
পশুত্ব নিপাত যাক!

সাবিনা
Member

খুব সুন্দর লেখা।

wpDiscuz