“সেই তিনি; এই আমরা”
লিখেছেন আলোকিত প্রদীপ, ডিসেম্বর ১০, ২০১৪ ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

রকু প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা  করছে। প্রতিদিনের মত আজকের অপেক্ষার পালাও একটু পর শেষ হবে। বাবার ঘুমানোর জন্য অপেক্ষা করছে রকু। বাবা ঘুমালেই তার ঘর আলোকিত হবে স্নিগ্ধ মোমের আলোয়। সে আলোয় জ্ঞানের সাগরে ডুবে যাবে দুই কিশোর-কিশোরী। অবশেষে গভীর রাতে কুরুয়া পাখির কা আক কা আক কু ডাকে ইব্রাহীম বুঝতে পারবে আদরের ছোট বোনকে পড়াতে পড়াতে আজও রাত তিনটা বেজে গিয়েছে।

বাবা বাংলা ও ইংরেজী শিক্ষার ঘোর বিরোধী হওয়ায় এমনই ছিল বেগম রোকেয়ার শিক্ষা জীবন। কোন স্কুল-কলেজ নয়, ভাইয়ের কাছ থেকেই শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি। ভাই ইব্রাহীমের বপন করা আকাঙ্খার বীজ ধীরে ধীরে এক ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয় এবং আমরা রকুকে পাই বেগম রোকেয়া হিসেবে।

বেগম রোকেয়ার বাল্যকাল ছিল ঘরের মাঝে আবদ্ধ। শিশু কাল থেকেই কঠোর অবরোধ প্রথার কারণে পুরুষ তো দূরের কথা; পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া ও চাকরানী ছাড়া কোন মেয়ের সামনেই তিনি বের হতে পারতেন না। বাড়িতে যদি অন্য কোন মহিলা আসতেন তাহলে যখন যেখানে পারতেন লুকিয়ে থাকতেন। কখনো তার জায়গা হতো রান্না ঘরের ঝাপের অন্তরালে, কখনো চাকরানীর গোল করে জড়িয়ে রাখা পাটির ভেতরে কিংবা আরও ভয়ঙ্কর কোন জায়গায়।

এ রকম পরিবেশেই রকু প্রবল বাঁধা উপেক্ষা করে একটু-আধটু শিক্ষা গ্রহণ করতে করতে বড় হয়। পরবর্তীতে অষ্টাদশ বয়সী রোকেয়ার বিয়ে হয় বিপত্নীক সাখাওয়াতের সাথে। মাত্র দশ বছর পর তিনি বিধবা হয়ে যান। কুসংস্কার বর্জিত, উদার হৃদয়, উন্নতমনা সাখাওয়াতের সাহায্য রোকেয়ার নারী জাতির উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণের অন্যতম উৎস ছিল।

বিয়ের পর রোকেয়া বিহারের নারীদের করুণ অবরোধ প্রথা, অশিক্ষা ইত্যাদির সাথে পরিচিত হন। রোকেয়া পর্দা প্রথার বিরোধী ছিলেন না। তবে, তিনি চরম ক্ষতি সাধনকারী অবরোধ প্রথার ব্যাপারে সকলকে সচেতন করার ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। পরবর্তীতে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ জীবন তিনি নারী ও সমাজের মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে গিয়েছেন। সাখাওয়াতের মৃত্যুর পাঁচ মাস পর রোকেয়া মাত্র পাঁচ জন ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

কখনো বিদ্যাপীঠে না যাওয়ায় রোকেয়া প্রথম দিকে কিছুতেই বুঝতে পারতেন না একজন শিক্ষিকা কিভাবে একই সময়ে এক সাথে পাঁচটা মেয়েকে পড়াতে পারেন। কিন্তু বাঁধা আসলে থেমে যাবার মতো নারী রোকেয়া ছিলেন না। পারিবারিক কোন্দলের কারণে এ স্কুলটি স্থায়ী না হলে রোকেয়া কোলকাতায় নতুন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কিংবা ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল বা অন্যান্য স্কুল অনেক সময় ব্যাপী নিরীক্ষণ করে তিনি তার স্কুলকে উন্নত থেকে উন্নততর করেছেন। তবে সমাজের গুটি কয়েক মানুষ তাকে উৎসাহ দিলেও বেশীর ভাগ মানুষ তার কাজের প্রবল বিরোধিতা করেছে।

চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও বেগম রোকেয়া চরম প্রতিবাদী ছিলেন। তৎকালীন সামাজিক বিরুদ্ধতা ও সঙ্কীর্ণতায় চূর্ণ বিচূর্ণ হলেও লেখনী ও কর্ম ক্ষেত্রে তিনি থেমে থাকেন নি। নারীকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে আঞ্জুমানে খাওয়াতিন প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজের মানুষ প্রথম প্রথম চরম বিরোধিতা করলেও ধীরে ধীরে তার আহবান কিছুটা বুঝতে পারে। তার প্রচারণার দশ-বারো বছর পর সচেতনতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সিসেম ফাঁক প্রবন্ধে রোকেয়া বলেনঃ
“গরীবের কথা বাসি হইলে ফলে।”
রোকেয়া বাঙ্গালী নারী-সমাজ ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে যেয়ে ভাবনার প্রতিফলন সমূহ নিজ লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। বেগম রোকেয়া তার লেখনীর দ্বারা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা তুলে ধরে তা সমাধানের উপায়ও বলে দিয়েছেন। শুধু লিখেই তিনি ক্ষান্ত হন নি। তিনি প্রতিটি বাড়িতে যেয়ে সকলকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। ধীরে ধীরে তিনি স্কুল, সভা-সমাবেশ ইত্যাদিতে নারীর পদচারণা বাড়াতে সক্ষম হন। তবে তৎকালীন সভা আমরা বর্তমানের সভার সাথে তুলনা করতে পারি না। সে সময়কার সভার চিত্র সম্পর্কে শামসুন নাহার মাহমুদের “রোকেয়া জীবনী” গ্রন্থের একটি বর্ণনা দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম নাঃ
“রোকেয়া বলিতেন, ‘যে কক্ষে সভা বসিত প্রত্যেকটি অধিবেশনের পর তাহার দেওয়ালগুলি পানের পিকে এমন রঞ্জিত হইয়া যাইতো যে, প্রত্যেক বারেই চুনকাম না করাইলে চলিত না।       স্বয়ং সভানেত্রী হইতে আরম্ভ করিয়া সমাগত মহিলাদের মধ্যে কেহই অনুভব করিতেন না, যে-সময় সভার কাজ চলিতেছে অন্ততঃ সে-সময়টুকু নিজ নিজ আসনে স্থির হইয়া বসিয়া থাকা প্রয়োজন।”
১৯৩২ সালে ৯ ডিসেম্বর এ মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সমাজ ও নারীর জন্য কাজ করে গিয়েছেন। বর্তমান যুগে বাহিরে নারীর পদচারণা ও অগ্রগতির পেছনে এ মহীয়সী নারীর অবদান কিছুতেই অস্বীকার করা সম্ভব না। নারীকে সামগ্রিক শিক্ষা প্রদান করে বিচক্ষণ করে তোলাই ছিল রোকেয়ার উদ্দেশ্য।  তার স্কুলে তাফসীর সহ কুরআন, ইংরেজি,বাংলা, উর্দু, ফার্সি, হোম নার্সিং, ফার্স্ট এইড, রন্ধন, সেলাই ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দেয়া হতো।

সমাজ থেকে কোন ভ্রান্তি দূর করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাঁধা-বিপত্তি আসবেই। বেগম রোকেয়ার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কিন্তু চরম কঠিন সময়ও তাকে থামাতে পারেন নি। কারণ তার মনে ছিল অদম্য শক্তি। রোকেয়ার কর্ম স্পৃহার মূল মন্ত্র সম্ভবত আমরা তার মুখ নিঃসৃত একটি বাক্য দ্বারাই অনুধাবন করতে পারি-
      “যদি সমাজে কাজ করিতে চাও, তবে গায়ের চামড়াকে এতখানি পুরু করিয়া লইতে হইবে যেন নিন্দা-গ্লানি, উপেক্ষা- অপমান কিছুতেই তাকে আঘাত করিতে না পারে; মাথার খুলিকে এমন মজবুত করিয়া লইতে হইবে যেন ঝড়ঝঞ্ঝা, বজ্র বিদ্যুৎ সকলেই তাহাতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে।”
গড্ডালিকা প্রবাহে না ভেসে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার শিক্ষাই রোকেয়া সমগ্র সমাজকে দিতে চেয়েছেন। তার এ শিক্ষা এই আমরা এখন এই বর্তমান যুগে আদৌ ধারণ করতে পেরেছি কিনা তার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

পোস্টটি ৪৪২ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য

Leave a Reply

4 Comments on "“সেই তিনি; এই আমরা”"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
শুকনোপাতার রাজ্য
Member

চমৎকার লিখেছেন। প্রথম দিকে আরেকটু প্যারা হলে ভালো হতো,কিন্তু শুরুটা সুন্দর ছিলো। মাশাআল্লাহ… :)

রাহনুমা সিদ্দিকা
Member

বলেছো খুব তাড়াহুড়া করে লিখেছো- আমার কিন্তু overall ভালো লেগেছে।

ব্লগে আসলে বড় পরিসরে লেখা কঠিন। একটা ব্লগপোস্টে প্রিসাইসলি কাভার করা যায় এভাবে লিখলে আরো আকর্ষণীয় হতো।

আর শুরুটা সত্যিই সুন্দর হয়েছে। কলম চলমান থাকুক। লিখে যাও। শুভেচ্ছা রইলো।

বেগম রোকেয়ার কোনো একটা বইয়ের রিভিউ লিখে ফেলো না!! অপেক্ষায় থাকলাম।

wpDiscuz