টুকরো সময়…
লিখেছেন নভো নীল দীপ্তি, নভেম্বর ১১, ২০১৭ ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

“উফফ..আজকেও দেরী..”গজগজ করতে করতেই দৌড়ে ওভারব্রীজের দিকে ওঠতে লাগলো নামিরা।এই মুহূর্তে পৃথিবীতে তার একটাই সমস্যা, যে করেই হোক আজকে বাস মিস করা যাবে না।একটুর জন্য বাস মিস করা ইদানিং রীতি মত তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে..বাস মিস করার দুঃখ পুরো সকালটা মাটি করার জন্য যথেষ্ট। পৃথিবীতে সবার ওপর চিল্লায়ে রাগ ঝাড়া যায় বাট নিজের ওপর রাগ ওঠলে কি কিছু করা যায়!খালি নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছা করে এবং তা ইচ্ছা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ… 

এইসব সাত পাচ ভাবতে ভাবতেই এই ছোটখাট পর্বতসম বস্তু পাড় হওয়ার নিমিত্তে নিরন্তন ছুট লাগালো নামিরা।

মানুষের সবচেয়ে অপরিবর্তনীয় অঙ্গ কোনটি বলুন তো..???বা কিসের দিকে তাকিয়ে মানুষ শত সহস্র বছর পরও একে অন্যকে চিনতে পারে..??? হুম,সেটা আর কিছু নয় চোখ.. হ্যা,আর সে জন্যই হয়তোবা সামনে সেই চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে নিমিষেই দাড়িয়ে গেল নামিরা…

ছুটন্ত বাতাসের গতি কি কখনো থামিয়ে দেয়া যায় অথবা এর লাগাম টেনে ধরা…সকালবেলা বাসে চড়ার এই এক অন্য রকম ভাললাগা..ভোরের আগমনী বাতাস তখনো শেষ হয়ে যায় না..তপ্ত বাতাস তখনো বইতে শুরু করে না..নাগরিক জঞ্জাল তখনোও জমতে শুরু করে না.জানালার পাশের জায়গাটায় বসে অর্ধঘুমন্ত শহরটা দেখা..অবশ্য এই শহর কখনইবা ঘুমায় আর কখনইবা জাগে, সে এক গবেষণার বস্তু।একই সময়, একই রাস্তা তবুও এই পথচলায় কোন ক্লান্তি নেই..

নামিরা আনমনেই নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা,”সুখী মানুষগুলো চেনার উপায় কি..???” নামিরার এর উত্তরে বরাবরই মনে হয় “এক জোড়া ক্লান্তিহীন চোখ..”। নামিরা নিমিষেই চোখ বন্ধ করে সেই পুরোনো দেখা একজোড়া চোখ মনে করার চেষ্টা করল! আবার কিছুক্ষণ আগে দেখা চোখগুলোকে চোখের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করে..নাহ,কিছুই মিল নেই আর..

শীতের শুরুর দিকে সকালগুলোর ভিন্নতা সম্ভবত এখানেই যে এর শীতল মাদকতাময় বাতাস আপনার স্মৃতির বাতায়ন খুলে দেয়ার প্রবল শক্তি রাখে…যেখানে তীব্র শীতের দিনগুলোতে কপাটগুলো বরফের নিচে আটকে পড়ে..

সেই যে নিজেকে চেনার সেই সোনায় মোড়ানো দিনগুলি অথবা মনের নদীতে রঙিন কাগজে বানানো ছোট্র সেই নৌকা ভাসানোর দিনগুলিতে পাশ জোড়া সব ঝলমলে সেই চোখগুলো…শত বছর পরেও কি ভোলা যাবে সেই চোখ..এই মানুষগুলো কখনো নিজেকে পড়তে দেয় না…সুহাসিনী ভোরের মতো তাদের চোখের পাতাগুলো সবাই দেখতে পায় না তাই তো সবাই তা পড়তেও পারে না..

ছুটন্ত বাসের দুরন্ত ছুট চলা প্রায় শেষ..এখনই নামতে হবে নামিরার..হঠাতই জানালার পাশ দিয়ে ছুটে চলা ট্রাকটার দিকে তাকাতেই বাস্তবে ফিরে এলে.. গায়ে পাঞ্জাবী আর মাথায় টুপি পরা কিছু ভাব লেশহীন মুখ আর তাদেরই ফাকে এক নিশ্চল লাশ…!!!

পৃথিবীতে সামনে সবচেয়ে ভয়ংকর দিনের আগমনী বার্তা সম্ভবত এটাই কিছু প্রাণসম্পন্ন অনুভূতিহীন কিছু দ্বিপদী প্রাণী চলাচল…!!

নামিরার প্রশ্ন জাগে , ঐ যে নিশ্চল মানুষটা, তার বুকের ভিতর যে সমুদ্রতল অবধি যে ভালবাসাগুলো ছিল সেগুলো আজ কোথায়…???একদিন তার সামান্য স্পর্শে যে ভালবাসারা ভালবাসার নদীতে দিগন্তরেখা অবধি চর জাগাতো অথবা তাদের সেই স্পর্শ ভালবাসাময় দোয়ার বর্ষণ হতো, সেই ভালবাসাগুলো আজ কোথায় চলে যাবে..??? চোখ ভারী হতে লাগলো নামিরার…না,প্রশ্নগুলোর কোন সদুত্তর, সে খুজে পায় না…সম্ভব এর উত্তর কেউ জানে না..

বাস থেকে নেমে ক্যাম্পাসেরর দিকে হাটতে শুরু করলো নামিরা..দিনের তপ্ত হওয়া তখন বসতে শুরু করে দিয়েছে..শরতের বেতাল মেঘ আজও কিছুটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে..

চলার পথে শিউলি ফুল গাছটার নিচে একবার থমকে দাড়ালো.. মাটিতে বসে ঝরে পড়া সেই সাদাশুভ্র পুষ্করিণী হাতে তুলে নিলো…ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে মাটিটা স্পর্শ করতেই অন্য কোন ভালো লাগা ছুয়ে দিয়ে গেল তার মনকে…সম্ভবত ঐ যে মাটির নীচের মানুষগুলো আর তাদের সেই অতলস্পর্শী ভালবাসা গুলো মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়..তবেই তো সেই ভালবাসায় এতশত মোহনীয় ফুলের জন্ম হয়….মানুষও সম্ভবত তাই সেই মাটিটাকে এত ভালবাসা……..

 

 

পোস্টটি ৩৭ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
১ টি মন্তব্য

Leave a Reply

1 Comment on "টুকরো সময়…"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
শুকনোপাতার রাজ্য
Member

সুখী মানুষ বা সুখ… অদ্ভুদ বটে!

wpDiscuz