ওয়ারী বটেশ্বর শেখরের সন্ধানে অভিযাত্রীর অভিযান
লিখেছেন অঘটন ঘটন পটীয়সী, ডিসেম্বর ৪, ২০১৭ ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
24581190_1633223310100754_52618774_n

এখনো ভোরেরা আলো ফোটেনি।চটজলদি নামাজ পড়ে রেডি হয়ে নিলাম।কাঁধে একটা ব্যাগ আর সাথে অভিযাত্রীসুলভ মন নিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে।আমাদের আজকের গন্তব্য আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা উয়ারী-বটেশ্বর।যার অবস্থান ঢাকা থেকে ৭০ কি.মি উত্তর-পূর্বে নরসিংদি জেলার বেলাব,শিবপুর ও মনোহরদি উপজেলায়।
ঠিক ৬:৩০ মিনিটের মধ্যে আমাদের সবাইকে গুলিস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমি কিছুটা দেরী করে ফেলেছি।অবশ্য মঞ্জুরভাই রিপোর্টিং টাইমের মিনিট আগেই এসে পৌছিয়েছেন।আমাদের বিদায় জানাতে সাইকেল নিয়ে হাজির হয়েছে ইউসুফ ।কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হলাম সে আমাদের সাথে যাবে না বলে।টার মধ্যে প্রায় সবাই চলে আসলো।পোপের আগমণে দুইজনের প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেল।
সবাই চলে এসেছেন। এখন বাসে উঠার পালা। আমরা মোট ১২ জন অভিযাত্রী।কিন্তু বাসে এতোটা সীট নেই তাই আমরা পরবর্তী বাসের জন্য অপেক্ষা করছি।পরের বাস আসতে আসতে প্রায় ৮টা বেজে গেল। সূর্যও এর মধ্যে তেজি হতে শুরু করেছে।

অবশেষে ঠিক ৮টা বেজে ৪মিনিটে তিশা বাস চলতে শুরু করলো।আমার পাশে বসেছে চাঁদনি।সবাই মোটামুটি ক্ষুধার্থ। চাঁদনি সবাইকে আলুর চিপ্স দিলো।তা খেয়েই সবাই সকালঘুম দিচ্ছে যার যার সীটে বসে।ইমাম ভাইয়া এই সুযোগে তার শখের ঘুম ছবি তুলে নিচ্ছেন।যদিও আল্লামা ভাইয়ার টা ক্লিক করার আগেই সে চোখ খুলে ফেলেছেন ।আর আমার একটু চোখ লেগে আসে তো সাথে সাথেই বাস ড্রাইভারের রেসিংকার স্টাইলের গাড়ি চালানোর চোটে আতঙ্কে উঠে যাই।অবশ্য কিছুদূর যাওয়ার পর আল্লামা ভাইয়া ভালো একটা ধমক দিয়ে আসলেন গাড়ি চালককে।যার ফলে অন্তত কিছু সময় ঘুমিয়ে নিতে পারলাম ।
সকাল ১১টা বেজে ৫ মিনিট, আমরা বাড়িচা বাজার বাসস্ট্যান্ডে এসে নামলাম।বাস থেকে নামতেই ধনে পাতার ঘ্রাণে মন ভরে উঠলো।তাকিয়ে দেখলাম রাস্তার ধারে ধনে পাতা,লালশাক সহ আরো অনেক কাঁচা সবজি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।এখানে আমাদের জন্য ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে আছেন হিমু পরিবহনের ৪জন সদস্য।তাদের উষ্ণ অভ্যর্থণায় কিছুটা বিব্রত হয়ে গেলাম আমরা।বলতেই হবে অভিযাত্রীর জন্য এটি একটি ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা।
বাড়িচা বাজার বাসস্ট্যান্ডে একটি হোটেলে বসে আটার রুটি,ডিম ভাজি আর সবজি-ডাল এবং চা দিয়ে সেরে নিলাম আমাদের সকালের নাস্তা।এদিকে আল্লামা ভাইয়া আমাদের জন্য এই এলাকার বিখ্যাত কলা এবং মুরির মোয়া কিনে নিলেন।

১১:১৮মিনিটে আমরা এখান থেকে অটোতে করে রওনা হলাম উছিলারবর গ্রামের দিকে।এই গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে আড়িয়াল খাঁ নদী।কিছুটা পথ অটোতে যেয়ে আমরা অটো ছেড়ে দেই।এখান থেকেই মুলত শুরু হচ্ছে অভিযাত্রীর যাত্রা।আমরা পাকা রাস্তা বাদ দিয়ে শর্পিলাকার আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড় ধরে হেটে যাচ্ছি।খুব সরূ রাস্তা ,সবাই সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে একটু একটু করে হাটছি।আমাদের ডান দিকে কাঁদায় পূর্ন আড়িয়াল খাঁ নদী আর বায়ে ধনে পাতা,পেয়াজ,ফুলকপি,পাতাকপি সহ আরো বেশ কিছু মৌসুমি সবজির ক্ষেত।কিছু দূর যেতেই শিম ক্ষেত।কি অপূর্ব এই ক্ষেতের চিত্র!একটা গাছে কত রঙের বাহার।সুবহান আল্লাহ।আমরা এই নদীর পাড় ধরে প্রায় ৩কি.মি হেটে গেছি।তারপর আর যাওয়া যাবেনা। বাধ্য হয়েই আমরা ১২টা বেজে ১০ মিনিটের দিকে পাকা রাস্তায় উঠে এলাম।

এখানে ২ মিনিটের ব্রিফিং দিবেন আল্লামা ভাইয়া।বেগ ভাইয়ার ছোট্ট কিছু পরামর্শ অভিযাত্রীকে স্বরণ করিয়ে দিলেন।যেমন-অভিযাত্রী এখানে কিছু শিখাতে আসেনি বরং কিছু শিখতে এসেছে/কেউ অকারনে কোন পাতা ছিঁড়বেন না/গ্রামের পথে এমন কোন আচরণ করা যাবে না যাতে গ্রামের মানুষ বিরক্ত হতে পারে………


আমরা লাল মাটির রাস্তা ধরে হেটে যাচ্ছি।১৬ জন অভিযাত্রী মোটামুটি ৩টি ভাগে হাটছে।সবার পেছনে আমি আর আল্লামা ভাইয়া।নদীর পাড় ধরে হাটতে না পারার দুঃখটা আমাদের কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে গেল লালমাটির রাস্তা দেখে।ছবির মত একটা গ্রাম যার রাস্তাগুলো বেশ প্রসস্থ।লাল মাটি ছাড়াও কিছু সাদা কঙ্কর দেখা যাচ্ছে মাটিতে যা আমাদের বলে দিচ্ছে রাস্তাটি বেশ পুরনো।রাস্তার দুইধারে মাঝেমাঝে দেখা যাচ্ছে ধান ক্ষেত আবার কিছু দূর এগুলেই সবজি ক্ষেত।বাড়িগুলো লাল মাটির তৈরী।সব কিছুর মধ্যেই যেন একটি শৈল্পিকভাব রয়েছে।

এছাড়া কাঁচা পাতা আর মাটির ঘ্রাণ মিলিয়ে কেমন একটি মাতাল করা ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে পুরো পথটায়।এই ঘ্রাণেই যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে আমাদের।


ঠিক ১২টা ৪০ মিনিটে আমরা আমলাব ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এসে পৌঁছলাম।এখানে রাস্তার পাশে কাঠের গুড়ি পরে আছে।কয়েকজন অভিযাত্রী সেখানে বসে বিশ্রাম করছে আর কয়েকজন বোতলে পানি নিচ্ছেন।এখানে একটি ব্রীজ দেখা যাচ্ছে যা আড়িয়াল খাঁ নদীর উপরে তৈরি করা হয়েছে আর অন্য পাশেই বাজার।বাজার দিয়ে ঢুকতেই উয়ারী-বটেশ্বর লেখা বোর্ড দেখতে পেলাম ।এখন আমরা যেই রাস্তা ধরে হাটছি তা কাঁচা মাটির নয় বরং কংক্রিটের রাস্তা।

প্রায় ২০ মিনিট হেটে রাজারবাগ গ্রামে একটি মসজিদ পেলাম আমরা।কিন্তু তখনো ওয়াজ হচ্ছে আর অন্যদিকে কোন বাড়িঘর দেখা যাচ্ছেনা যেখানে মেয়েরা নামাজ পড়তে পারবে।তাই আমরা বিরতি না নিয়ে হাটতে শুরু করলাম।এই গ্রামটি যতদূর আমরা হেটে গেলাম পুরোটাই কংক্রিটের রাস্তা।
১টা বেজে ২০ মিনিট।সুর্যের তাপকে অগ্রায্য করে আমরা প্রশস্থ একটি রাস্তা ধরে হাটছি।পাশেই দেখা যাচ্ছে নতুন ধান বপন করছেন কৃষকেরা।কিছুদূর যেতেই ছায়া পথ।এখানে পথের পাশেই লেবু বাগান।কয়েকটা গাছে লেবু ফুল দেখা যাচ্ছে।আবার সূর্যপথ।এখানে দেখতে পেলাম প্রায় ৬/সাড়ে৬ ফিট উচ্চতায় চিকুন সুতা দিয়ে পুরো জমিটাকে বাঁধাই করে রেখেছে আর তার নিচে দুইজন কৃষক জমিতে কাজ করছেন।ধারনা করলাম এখানে শিম বা এই জাতীয় কোন লতা সবজির চাষ হবে।


সময় ১:৫০ মিনিট।আমরা বটেশ্বর গ্রামে স্যার হাবিবুল্লাহ পাঠানের বাড়িতে এসে পৌছেছি।আমাদের ফুলের তোড়া টি দিয়ে স্যারকে শুভেচ্ছা জানালাম।তার বাড়ীটিই একটি সংগ্রহশালা।আমরা ঘুরে ফিরে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো শিলপাটা,বদনা,রৌপ্য ও ব্রোঞ্জের মুদ্রা,বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মুদ্রিত কুরআন,১৯শতকের হস্ত লিখিত কুরআন, ৫গ্রামের বাটখারা দেখলাম।এখন স্যারের সাথে আমাদের কিছু আন্তরিক কথাবার্তার পালা।স্যার তার জীবনের গুরুত্বপূর্ন কিছু ঘটনা তুলে ধরলেন।আমরা সবাই অভিভূত হয়ে শুনলাম।


বেলা ঠিক ৩টায় আমরা স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আগের রাস্তা ধরে হাটা শুরু করলাম।এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে আমরা উয়ারী যাবোনা।কারন সেখানে আপাতত কিছুই দেখার নেই।সবই মাটি চাপা দেয়া হয়েছে।বিখ্যাত দার্শণিক লাও জু এর একটি উক্তি বলা যায় এই ক্ষেত্রে-‘একজন ভালো অভিযাত্রীর কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং গন্তব্যে পৌছানোর উদ্দেশ্য থাকেনা’।

অত:পর আবার আমাদের হাটা শুরু।সবাই আমরা ক্ষুধার্থ।তাই আল্লামা ভাইয়া তার ব্যাগ থেকে এখানের বিখ্যাত সেই মুরির মোয়া বের করে দিলেন।কিছুদূর যেতেই আমাদের হাটার অবসান হলো।কারন আমাদের এখনের উদ্দেশ্য দারুচিনি রেস্টুরেন্ট।জায়গার নামটা ঠিক মনে নেই।এখন পর্যন্ত আমরা প্রায় ১০ কি.মি পথ হেটেছি।


৪ টা বেজে ২০ মিনিট।আমরা দারুচিনি রেস্টুরেন্টে পৌছে গেলাম।যে যার পছন্দের খাবার খাচ্ছে।আমি নিলাম রুইমাছ।খাবার টা খুব ফ্রেশ ছিল।ডালে পাঁচফোড়নের ঘ্রান।যদিও এই ঘ্রাণটা আমার তেমন ভালো লাগেনা।
৪টা বেজে ৪০ মিনিট।এখন ভোটাভোটি হচ্ছে টুঙিরটেক বোদ্ধমন্দিরে যাবো নাকি স্টেশনে যাবো তা নিয়ে।ঢাকার উদ্দেশ্যে শেষ ট্রেন রওনা দিবে সন্ধ্যা ৬টায়।এদিকে আমাদের হাতে সময় আছে ১ঘন্টা ২০মিনিট বা তার কিছু কম।এইক্ষেত্রে আল্লামা ভাইয়ার বিশ্লেষণ-No risk No gain। অত:পর অর্ধেকের বেশি ভোট পেয়ে টুঙ্গিরটেক জিতে গেল।


৪টা বেজে ৪৫ মিনিট।আমরা একটি লেগুনা ভাড়া করলাম।সবার জায়গা না হওয়াতে ২জন অভিযাত্রী দরজায় লেগুনায় ঝুলে রওনা হলো। লেগুনা চলতে শুরু করেছে দ্রুত গতিতে।সময়ের মধ্যে পৌছাতে না পারলে ট্রেন মিস হবে।লেগুনার ভেতরে সুরে-বেসুরে চলতে থাকলো গান।


ঠিক ৫টা বেজে ১০ মিনিটে আমরা বৌদ্ধ মন্দিরে পৌঁছলাম।সবাইকে ঠিক ৫টা ১৪ তে আসার কথা বলে দিলেন আল্লামা ভাইয়া।আমি কিছুটা উপরে উঠে দেখতে পেলাম মাটিগুলো আলগা হয়ে আছে তাই দ্রুত নেমে এলাম।কারন এই মাটির নিচেই বৌদ্ধ মন্দিরটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।একটি বোর্ড আর উচু মাটির টিলা ছাড়া কিছুই দেখার নেই এখানে। আমরা ঠিক ৫টা ১৫তে এখান থেকে রওনা হলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে।এরই মধ্যে মাগরিবের আজান।চারিদিকে অন্ধকার নামছে।ট্রেনেরে চিন্তায় সবাই গপাগপ খেজুর খেতে থাকলাম একেরপর এক।লেগুনা ততক্ষনে হাইওয়েতে উঠে গেছে।ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে লেগুনা,অভিযাত্রীর সেই হেরে গলার গান আর তার সাথে হাইওয়েতে দুরপাল্লার বাসের হেডলাইট আমাকে কুপোকাত করে ফেলছে।মাঝেমাঝে মনে হচ্ছে এই বুঝি কোন বাস এসে ধাক্কা দিয়ে যাবে গাড়িকে,আবার মনে হচ্ছে লেগুনা উল্টে পরে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ৬টা বাজতে আর পাক্কা ১০মিনিট বাকি।এর মধ্যে লেগুনা এসে থামলো গ্যাস নেয়ার জন্য।আমাদের চিন্তা দ্বিগুন হয়ে গেল। আবার চলতে শুরু করলো লেগুনা।চলছে তো চলছে স্টেশন আর আসেনা।এদিকে ৬টা বেজে গেছে।ঘড়ির কাটা তার আপন গতিতে ১মিনিট করে বেড়েই চলেছে।আমরা মোটামুটি সবাই বুঝে গেলাম আমরা ট্রেনে যেতে পারবো না,বাসেই যেতে হবে।অবশেষে ৬টা ৮মিনিটে আমরা স্টেশনে এসে জানতে পারলাম এখনো ট্রেন ছেড়ে যায়নি।ব্যস এবার যে যার মত দৌড়।একদম শেষ দিকে এসে বগির গেট খোলা পেয়ে একে একে উঠে গেলাম।আলহামদুলিল্লাহ।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিলো।


বিদায় নরসিংদী।তোমার ওই পোড়ামাটির ফলক দেখার টানে নয় বরং তোমার মাটি আর কচি পাতার ঘ্রাণ নিতে আবার আসতে চাই।তোমার সেই লালমাটির রাস্তা ধরে আবার একদিন হাটতে চাই।আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড় ধরে আর একবার শিমের বাগানে হারিয়ে যেতে চাই।
আজ এই পর্যন্ত।অভিযাত্রীর নতুন কোন অভিযান নিয়ে আবার কখনো হাজির হবো।সেই পর্যন্ত শুভ কামনা।

পোস্টটি ৬৫ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz